গোলাপের নাম

মার্চ 17, 2012 § ১ টি মন্তব্য

ছোট ভাইয়ের ছেলেটা একদিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল- আচ্ছা, ফুপি হিটলার যখন জার্মানীতে ছিল, তখন কি সবাই ওকেই সাপোর্ট করেছিল? আমি চিন্তায় পড়ে যাই। এমনতো ভাবিনি। বই পত্রে তো পড়েছি রেজিট্যান্স যোদ্ধাদের কথা আর জার্মান ভিন্ন মতালম্বীদের জেলে আর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাবার কথা। ওকে সেগুলো বললাম, কিন্তু দেখলাম ও চাইছে নাম, তারিখ এসব। আমি ছোট একটা গল্প শুনেছিলাম জার্মানীতে গিয়ে। সেটার উপর ভিত্তি করে সার্চ দিলাম। পেয়ে গেলাম আমার মনের মত তথ্য ওকে বলার মত।

উপরের সারি বাম থেকে প্রফেসর কুর্ট হুবের, অ্যালেক্স শ্মোরেল, ক্রিস্টফ প্রোবস্ট, নীচের সারি বাম থেকে হান্স শোল, সোফি শোল, ভিলি গ্রাফ

সাদা গোলাপ নামের একটি গোপন দল ১৯৪২ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন লিফলেটের মাধ্যমে হিটলারের শাসনের বিরোধীতা করেছিল , ঝুঁকি নিয়েছিল মৃত্যুর। সাদা গোলাপ দলের মূলে ছিলেন মিউনিখ বিশ্ববিদযালয়ের বেশ কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী-হান্স শোল, সোফি শোল, ক্রিস্টফ প্রোবস্ট, অ্যালেক্স শ্মোরেল, য়ুর্গেন ভিটেনস্টাইন, ভিলি গ্রাফ, ট্রট লাফ্রেনৎস সহ আরও অনেক তরুণ-তরুণী এবং তাদের শিক্ষক কুর্ট হুবের। ১৯৩৮ সালেই সাদা গোলাপের জন্ম হয়বলা চলে । এ সময় য়ুর্গেন ভিটেনস্টাইনের আলাপ হয় অ্যালেক্স শ্মোরেলের , তাঁরা তখন মিলিটারি ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। দু’জনের মধ্যে আলাপ হয় রেজিট্যান্স সহ নানাবিধ বিষয়ে। ট্রেনিং শেষে দুজন ভর্তি হন মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে।সেখানে আলাপ হয় সমমনস্ক হান্স শোলের সঙ্গে। হান্স ছিলেন সাদা গোলাপের প্রতিষ্ঠাতা মূল ৬ জনের একজন। নিজেদের ভাল লাগার বিষয়গুলো আলাপ করতে এসে পড়ে হিটলারের শাসনের ভয়াবহতা কথা আর সেই সাথে অনুভব করেন কিছু করার। এঁদের প্রত্যকেরই ইহুদী বন্ধু ছিল, যাদের তাঁরা হারিয়েছিলেন। তাছাড়া বাড়ির পরিবেশও ছিল এক রকম, যেখান থেকে পেয়েছিলেন অবরুদ্ধ পরিবেশের বিরুদ্ধাচারণ করা।

তাঁরা ঠিক করেন লিফলেট লিখে পোস্ট করবেন। সব মিলিয়ে তাঁরা লিখেছিলেন ছয়টি লিফলেট। প্রথম থেকে চতুর্থ লিফলেটগুলো লেখেন অ্যালেক্স শ্মোরেল ও হান্স শোল। টেলিফোন বই থেকে ঠিকানা নিয়ে পোস্ট করেন সারা মিউনিখবাসীদের। লিফলেটে জার্মান জনগণকে নিজেদের বিবেক জাগ্রত করার ডাক দেয়া হয়। ১৯৪২-এর জুলাইয়ে সাদা গোলাপের পুরুষ সদস্যদের যেতে হয় ফ্রন্টে রাশিয়ায়। সেখানে গিয়ে তাঁরা আরও ভালভাবে বুঝতে পারেন এই অনর্থক যুদ্ধের অসারতা। ঐ বছরের হেমন্তে ছেলেরা ফ্রন্ট থেকে ফিরে নব উদ্যোমে সাদা গোলাপের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৪৩-এর জানুয়ারীতে হাতে চালান মেশিন দিয়ে তাঁরা মোটামুটি ছয় থেকে নয় হাজার লিফলেট ছড়িয়ে দেন স্টুটগার্ট, কোলন, ভিয়েনা, ফ্রিবার্গ, শেমনিৎস, হামবুর্গ, ইন্সব্রুক এবং বার্লিন পর্যন্ত। লিফলেটটি সৃষ্টি করে আলোড়নের আর গেস্টাপো সন্ধান করতে থাকে এর হোতাদের।

১৯৪৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী স্যুটকেসে করে অনেকগুলো লিফলেট ভরে হান্স আর সোফি যান ইউনিভার্সিটিতে। ক্লাস চলাকালীন সময়ে সিঁড়িতে আর করিডরে লিফলেট রেখে দেন, যেন ছাত্র-ছাত্রীরা বের হয়ে ওগুলো নিয়ে পড়তে পারে। এই পর্যন্ত ঠিক ছিল, কিন্তু সোফি লক্ষ্য করেন যে, স্যুটকেসে কিছু লিফলেট বাকী পড়ে আছে। তাই তিনি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে ছুঁড়ে দেন বাকী কপিগুলো। ব্যাপারটা নজরে আসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্মী জ্যাকব শ্মিডের ,সঙ্গে সঙ্গেই খবর চলে যায় গেস্টাপোর কাছে। গ্রেপ্তার হন হান্স ও সোফি শোল।হান্সের পকেটে পাওয়া যায় ক্রিস্টফের লেখা একটি লিফলেট। গ্রেপ্তার হন ক্রিস্টফও। জিজ্ঞাসাবাদের সময় হান্স জানান যে, নামটি তিনি নিয়েছেন জার্মান কবি ক্লেমেন্স ব্রেন্টানোর সাদা গোলাপ কবিতা শিরোনাম থেকে।

গ্রেপ্তারকৃত হান্স শোল, সোফি শোল ও ক্রিস্টফ প্রোবস্ট

একে একে সাদা গোলাপের সবাই গ্রেপ্তার হন। প্রহসনের বিচারে হান্স, সোফি এবং ক্রিস্টফের প্রাণদন্ড হয়। আদালতে অকুতোভয় সোফি বিচারককে বলেন-আমাদের মত আপনিও ভালই বুঝতে পারছেন যে যুদ্ধে আমরা হেরে গাছি। এটাকে স্বীকার করতে এত ভয় পাচ্ছেন কেন? ১৯৪৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী শিরশ্ছেদ করা হয় হান্স সোফি এবং ক্রিস্টফের। এরপর একে একে ধৃত সকলেরই প্রায় প্রাণদন্ড হয়। তাঁদের ষষ্ঠ লিফলেটটি চোরা পথে মিত্র বাহিনীর হাতে পৌঁছায়।
কি লেখা ছিল সেই শেষ লিফলেটে?

“আমাদের জন্য শ্লোগান একটাই- পার্টির বিরুদ্ধে লড়াই করুন! ত্যাগ করুন পার্টি, যা আমাদের মুখে তালা মেরে রেখেছ আর রাজনীতির জালে আটকে ফেলেছে! এসএস কর্পোরাল এবং সার্জেন্টদের আর তাদের পা চাটাদের লেকচার রুম থেকে বেরিয়ে আসুন! আমরা চাই সত্যিকারের শিক্ষা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা। কোন হুমকি-ধমকি আমাদের ভয় দেখাতে পারবেনা, এমনকি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলেও না। বিবেক আর নৈতিক দায়িত্ব থেকে এই আমাদের এই সংগ্রাম চলবে ভবিষ্যৎ,আমাদের স্বাধীনতা, আর সম্মানের জন্য…
…জার্মানীর জনগণ আজ একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। আমাদের প্রশ্ন হল আমরা কি আমাদের সৈনিকদের ভবিষ্যৎ একটা জ্ঞানশুণ্য লোকের হাতে ছেড়ে দেব? আমরা কি আমাদের বাকী জার্মান যুবসমাজকে একটা পার্টির উচ্চাকাঙ্খার কাছে বলি দেব? হিসাব নিকাশের দিন এসেছে জার্মান যুবসমাজের সাথে আমাদের কাছে সবচাইতে জঘন্য স্বৈরাচারীর সঙ্গে। জার্মান জনগণের পক্ষে থেকে আমরা এডলফ হিটলারের রাষ্ট্রের কাছে দাবী জানাই যে আমাদের সবচাইতে বড় সম্পদ ব্যক্তি স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া হোক, যা তিনি আমাদের কাছ থেকে ধাপ্পাবাজি করে নিয়ে নিয়েছেন…”

মৃত্যুদণ্ডে প্রাণ দেবার আগে সোফির শেষ কথা ছিল- আমরা কি করে আশা করি যে হঠকারীতার জয় হবে, যেখানে মানুষ হঠকারীতার জীবন দিতে চায়না নিজে থেকে? কি সুন্দর একটা রোদ ঝলমলে দিন, কিন্তু আমাকে চলে যেতে হবে। আমার মরে যাওয়ায় কিছু যায় আসে না, যদি এর মধ্যে দিয়ে হাজার হাজার মানুষ জেগে ওঠে।”
মিত্র বাহিনী তাদের ষষ্ঠ লিফলেটটি সম্পাদনা করে বিমানে করে জার্মানীর উপরে কয়েক মিলিয়ন কপি ছড়িয়ে দেয়।

সাদা গোলাপের  সকল সদস্য, বিশেষ করে সোফি আজ নতুন জার্মানীর প্রতীক। যারা তাদের আদর্শকে মাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। সোফিকে নিয়ে খুব সুন্দর একটি জার্মান ছবি আছে , আপনারা দেখতে পারেন- Sophie Scholl – Die letzten Tage।

XM5A4ETW_Io

এই বইমেলা, সেই বইমেলা

মার্চ 17, 2012 § মন্তব্য দিন

ছোটবেলা কবে প্রথম বইমেলা গেছিলাম মনে নেই। আবছাভাবে মনে পড়ে তখন কারা অংশ নিতে পারবে সেটা নিয়ে এত কড়াকড়ি ছিল না। রুশী বইয়ের স্টল ছিল। আম্মা মনে হয় কিছু বই কিনেও দিয়েছিল। এরপরের অনেক বছরের বইমেলার স্মৃতি আর মনে পড়ছে না। জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী দীপনের বাবা একবার আমাদের কতগুলো পত্রিকা বিক্রি করতে দিলেন মেলায়। তখন ভেতরে যে কেউ টেবিল নিয়ে বসে যেতে পারত। রোজ যেতাম মেলায়। সেবার স্টল থেকে অনুবাদ বইগুলো কিনতাম। ছোটমামা সেবা ওয়েস্টার্ন কিনে দিয়েছিল প্রথম বইমেলা থেকে। মেলায় কোন স্টলে একেবারে দোকানদারী করার অভিজ্ঞতা হয় চারদিক প্রকাশনীর স্টলে। এটার স্বত্বাধিকারী ছিলেন তখন ফিরোজ সারোয়ার। ওটা ছিল আমাদের একটা বাৎসরিক আড্ডাখানা! মেলার শেষদিন স্টলে থেকে বই মেরে আনতাম কিছু। এখান থেকে বের হয়েছিল জুবায়ের কাকার (মুহম্মদ জুবায়ের) প্রথম উপন্যাস ‘অসম্পূর্ণ’। আরেকটি উপন্যাস পরে নাটক হয়ে বিখ্যাত হয়েছিল- ‘কোথাও কেউ নেই’। স্টলে বসার উপরি ছিল মাগনা বই পড়া। আর শেষ দিনের চুরি তো ছিলই! কি অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা যে হত। একবার এক ছেলে এসে স্টলে জোর করে বই নেবার মাস্তানি করছিল, হঠাৎ তার নজরে পড়ে স্টলে বসা একটি ছেলের দিকে। কি হইতে কি হইয়া গেল বই-টই ফেলে মাস্তান গায়েব। পরে জানলাম স্টলের ছেলেটা ঐ ছেলের এলাকার আরও বড় মাস্তান! এরকম সময়ে বাইরের স্টল থেকে বই মারার হাতে খড়ি হয় আমার। অনিন্দ্য প্রকাশনীর স্টল থেকে কি একটা বই যেন মেরেছিলাম। বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটির স্টল থেকে কি সুন্দর সব পোস্টার কিনতাম বাইবেলের কাহিনী ভিত্তিক। বছর দু’ইয়েক আগে তোরাত শরীফ কিনেছিলাম। গত বছর যবুর শরীফ কিনতে দেখি ওনারা রাখেন নি। এরশাদ যখন গদীনশিন তখন তাকে নিয়ে কি কি সব কার্টুন আর পোস্টার বের হত, মনে পড়লে হাসি পায়। কিছু কিছু তো একেবারে আদিরসের চাক! চারদিকে বসার মজা যখন চলে গেল। দেখি দীপন মেলার মজা নেবার জন্য স্টল খুলেছে। সেখানে গিয়ে অবশ্য বসা হয়নি। ওর স্টল থেকে প্রথম কিনি ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’। পড়ে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখনও রোজ মেলায় যেতাম। রিক্সাভাড়া তো আর লাগত না। তবে কেনার মত বইয়ের সংখ্যা কমে গিয়েছিল। বইয়ের দামটাও একটা ব্যপার হয়ে দাঁড়ায়। আগে ছোটবোন আমার সাথে বইমেলা যে, গত বছর থেকে ভাইয়ের ছেলে আমার সাথে মেলায় যাচ্ছে। ওকে মেলায় নিয়ে বললাম যে বই চাও, কেনো। দেখলাম খুব বেশি বই কেনা লাগেনি। আমাদের ছোটবেলা কেউ যদি এমন বলত! আমি নিজে থেকে ওকে কিনে দিয়েছিলাম শিবরামের ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’। সব স্টল ঘুরে ওর মাত্র ছয়টা বই কেনায় আমি দুঃখিত হয়েছিলাম। মেলায় অনেক আগে দেখতাম চুড়ি-শাড়ীর স্টল। পত্রপত্রিকায় অনেক গালাগালির পর মেলা কর্তৃপক্ষ সেসব উঠিয়ে দেয়… তবে ২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্টল প্রকল্প চালু রাখে। এই দল-ঐ দল সব দলের স্টল, আবৃত্তি আর গানের সিডি আর কারুশিল্পের স্টল আজিও চোখে পড়ে। তবে একটা ভাল জিনিষ দেখি, কোন খাবারের স্টল নাই। উফ! কতবার যে এইসব স্টলের দাম নিয়ে মারামারির মধ্যে পড়েছি। আজকাল আর মেলায় রোজ গিয়ে নতুন বই খোঁজা হয় না, সকালে খবরের কাগজে দেখি নতুন কি বই আসবে। তারপর বিকালে চলে যাই কিনতে চাইলে। গতবছর গিয়েছিলাম ২/৩ দিন। মেলার মজা কি চলে গেল? লিখতে লিখতে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমি, সেতু আর অভীক মিয়ামামার সাথে মেলায় গিয়েছিলাম। সেতু একটা বই কিনতে চাইছিল, আর মামা কিছুতেই কিনে দেবেনা। শেষে সেতু রাগ করে কোথায় যেন চলে গেল। খুব খোঁজাখুঁজি করছি, এমন সময় পরিচিত একজন এসে জিজ্ঞেস করলেন “কি হয়েছে মিয়াভাই?” “সেতু বই কিনে না দেয়ায় কোথায় যেন গেছে, পাচ্ছি না।” সে মানুষটা সেতুকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে এল আর বইটাও কিনে দিল। বইটা ছিল মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘কপোট্রনিক সুখ- দুঃখ’, আর সে মানুষটা ছিলেন মুহম্মদ জুবায়ের। বইটা হারিয়ে গেছে, আর মানুষটাও নেই।

২/০১/২০১২

এমনি এমনি

নভেম্বর 7, 2011 § মন্তব্য দিন

এখন যাই লিখব খামাখা। কোন মানে-টানে নাই। আজকে আমার জন্মদিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুক খুলে দেখি wall writing  অনেক। ভাল, বেশ ভাল। একটা মেসেজ, দীপার। ওকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিয়েছিলাম। ও নাকি আমাকে চিন্তেই পারছে না! হা হতোস্মি!! একটা উত্তর লিখে দিলাম। দেখি ও মনে করতে পারে কিনা।

খুবই বিরক্ত লাগতেছে। কালকে উজ্জ্বলের সাথে মিটিং হলে হয়ত মেজাজটা সিধা হবে। দেখা যাক। সকালে লাবনী ফোন করল। আমার কথা বলতে তেমন ইচ্ছা করছিল না। তারপরও কথা বললাম। আমার আজকাল কথা-টথা একদমই বলতে ইচ্ছা করে না। শুধু শুধু…

~*~ সেদিনও আকাশে ছিল কত তারা ~*~

সেপ্টেম্বর 24, 2011 § মন্তব্য দিন


১।
সেদিনও ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর । সকাল থেকেই ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল। আম্মা গত কয়েকদিন থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি। ডাক্তাররা বলেছে বাচ্চার অক্সিজেন কমে আসছে, অতএব অপারেশন করতে হবে। সবাই খুবই চিন্তিত। আমরা ৩ ভাই বোন চিন্তিত কিন্তু উৎসুক বোন হবে না ভাই হবে এইটা নিয়ে। সবাই বড়ভাই সেতুর সঙ্গে শলা পরামর্শ করছি নতুন বাবুর নাম কি হবে সেটা নিয়ে। ও যেটা বলবে সেটাই ফাইনাল এই বাসায়। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে যায় ডাক্তাররা কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননা। আমরা সবাই দুপুরের খাবার জন্য বাসায় গেলাম কামাল কাকাকে রেখে।
আমাদের খাওয়া প্রায় শেষ কামাল কাকা হন্তদন্ত হয়ে বাসায় ঢুকল, ঢুকেই চেঁচিয়ে ঘোষণা করল মেয়ে হয়েছে। ব্যস বাকী খাওয়া কোন মতে খেয়েই আমরা দৌড় দিলাম মেডিক্যালের দিকে। মিয়ামামার হাতে মধুর বোতল। ডেলিভারির পর যেখানে বাচ্চাদের রাখা হয় সেখানে গেলাম আম্মাকে দেখে। গিয়ে দেখি কি টুকটুকে ফর্সা একটা বাবু শুয়ে আছে। তাড়াতাড়ি ক্যামেরা বের করে ছবি তোলা হল। বেচারা ফ্ল্যাশের আলোয় চোখ বন্ধ করে ফেলছিল।

২।
বাসায় সবাই যখন নিজের কাজে চলে যেত আমি ওকে রাখতাম। ও যখন ৯ দিন বয়সে বাসায় ফিরল, আমার ঘরেই ওকে শোয়ান হয়েছিল। একটু বড় হবার পর অদ্ভুত সব খেলা হত আমাদের- ও নরম জিন্দা লাশ, আমি শক্ত জিন্দা লাশ। আবার কখনো ও শিয়াল বন্ধু, আমি নেকড়ে বন্ধু। গোসল করতে খুবই আগ্রহী ছিল। আমাদের একটা কমন খেলা ছিল ওর সমস্ত গায়ে সাবানের ফেনা করব, তারপর কোলে নেব। পিছল সাবানের জন্য ও আস্তে আস্তে কোল থেকে পিছলে যাবে-এটাই ছিল মজা। ভাত খাবার সময় ওকে রূশ দেশের উপকথা থেকে গল্প পড়ে শোনাতাম। ওর লাল চুল, বাদামী চোখ আর অসম্ভব ফর্সা ত্বক দেখে অনেকে ওকে বিদেশী ভাবত।

৩।
আমাকে গল্প বলা থেকে রেহাই দিতে সে খুব দ্রুত গল্পের বই পড়া শিখে নেয়। একদিন নিজেই জোরে জোরে পড়ছে আমি আর আম্মা শুনছি। হঠাৎ শুনি বলছে-“…লাছুঙ্গা-গজঙ্গা…” আমরা দুজনেই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম ওটা কি? ও দেখাল বইয়েই তো লিখেছে। আমরা দেখলাম লেখা আছে : লাঞ্ছনা-গঞ্জনা! বাসায় কম্পিউটার আসার পর চট করে গেমস খেলার জন্য চালান শেখে। পরে আমাকে শিখিয়ে দেয়। এই যে এখন কম্পিউটারে কাজ করছি এর প্রথম শিক্ষা দাতা সে-ই। ও একটু বড় হবার পরই শুরু হয় ডিশ যুগ। কার্টুন দেখে চমৎকার ইংরেজী বলা শুরু করে- দেখে আমরা তো হাঁ।

৪।
সেই ছোট্ট মেয়েটি আজকে অনেক বড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আজকে ওর জন্মদিন। সারাদিন কত্ত লোক আসবে ওকে উইশ করতে। আমি ওকে উইশ করছি এভাবেই।

আমার প্রিয় বই?

অগাষ্ট 24, 2011 § 2 টি মন্তব্য

(লেখাটি ফেসবুকের বইপড়ুয়া গ্রুপের ই-বুকের জন্য লেখা)

আমার প্রিয় বই কোনটা অনেকে জিজ্ঞেস করে। আমিও ভেবে পাইনা কোন বইটাকে প্রিয় বলব। মৈমনসিংহ গীতিকার পালাগুলো আমার খুব পছন্দের, বিশেষ করে দেওয়ানা মদীনা আর মলুয়া। তাই আমার পছন্দের তালিকায় থাকতেই পারে মৈমনসিংহ গীতিকা। রবীন্দ্রনাথের গোরা বারবার পড়ি। শুধু সুচরিতা- গোরার কেমিস্ট্রির জন্যই না, ব্রাহ্ম আর হিন্দু সমাজের রেষারেষিটাও দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ যখন এই বই লিখেছিলেন, এর বছর ছয়েক পরে তাঁকে কার্যনির্বাহক সভার সম্মানিত সদস্য করা নিয়েই ব্রাহ্ম সমাজে বেশ একটা আন্দোলন হয় সমাজের নবীন-প্রবীণদের মধ্যে, নবীনদের নেতা ছিলেন সুকুমার রায় ও প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ।

ইতিহাস পড়তে না পারার খেদ মিটাই ইতিহাসের নানান বই পড়ে। একটা বই আছে দ্বিজেন শর্মার অনুবাদ করা, রুশ স্কুলের নাইন-টেনের ছেলে মেয়েদের জন্য- পৃথিবীর ইতিহাসঃ প্রাচীন যুগ। এত সুন্দর করে এত সংক্ষেপে ইতিহাস আর কোন বইতে পাইনি। আমার ছোটবোনকে এই বই পড়ে এক সময় ভাত খাওয়াতাম। আমরা বড় হয়ে গেলেও বইটা আমাদের খুব প্রিয়। রুশ আরেকটা বই আছে, যেটার কথা সবাই লিখবে- উভচর মানুষ। ইকথিয়াণ্ডরকে ভালবাসেনি এমন পাঠক পাওয়া মুশকিল। এখন যদি ভাবি, তবে তার জন্য খারাপ লাগে। সালভাতর তাকে একটা এক্সেন্ট্রিক জীবন দিয়েছেন সত্যি কিন্তু, এরপর? ইকথিয়াণ্ডর আমাদের কাছে অবশ্য চিরযুবা।

জ্যঁ আনুঈর আন্তিগোনে নাটকটা আমার খুব প্রিয়। যেখানে সোফক্লিসের আন্তিগোনে নাটকে ঈশ্বরের আর মানুষের আইনের বিবাদ আছে সেখানে জ্যঁ আনুঈ তাঁর আন্তিগোনে নাটকে ফরাসী মুক্তিবাহিনী আর নাৎসী হানাদারদের সিম্বোলিক ভাবে মুখোমুখ দাঁড় করিয়েছেন। নাটকটা লেখা ১৯৪৩ সালে। ফ্রান্স সে সময় জার্মানীর পদতলে।

আমার বড়ভাই আদিত্য কবিরের সাথে একটা খেলা হয় মজার। আমরা কথা নাই বার্তা নাই পাগলা দাশুর একটা লাইন বলে বাকীটা নিয়ে হ্যা হ্যা করতে থাকি। সুকুমার রায় আমাদের অসম্ভব প্রিয়। বিশেষ করে দাশু! হ-য-ব-র-ল’র শ্রীকাক্কেশ্বর কুচকুচে থেকে সবাই আমাদের প্রিয়।

উপেন্দ্রকিশোরের মহাভারত আমার প্রথম মহাভারত পড়া। তারপর কত বিচিত্র ভার্সনে যে পরেছি! শেষ পড়লাম শ্রীকালীপ্রসন্ন মহাশয়ের অনুবাদ গ্রন্থটি। কুরু- পাণ্ডবের যুযুৎসা আর দেব-দেবীদের অলৌকিক কার্যক্রম। আর সেই সাথে গল্পের বিস্তারিত শাখা-প্রশাখা আমাকে আশ্চর্য করে। আমার সবচাইতে প্রিয় দ্রৌপদী। অনেকে কর্ণকে পছন্দ করে, কিন্তু আমি কেন যেন তাকে কিছুতেই ভাল চোখে দেখতে পারিনি। প্রকাশ্য সভায় দ্রৌপদীকে বলা কথায় ঠিক মেনে নিতে পারিনি। মহাভারত আমার অতিপ্রিয়।

শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন আমার অসম্ভব প্রিয়। লীলাবতীর মধ্যে আবহমান বাঙালী নারীকেই পাই। ইতিহাস লীলাবতী, শ্যামাঙ্গ, মায়াবতী, বসন্তদাস এবং অভিমন্যুদাস- সবার জন্য স্থান নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। তারপরও কষ্ট লাগে লীলাবতী আর শ্যামাঙ্গর জন্য। জানতে ইচ্ছা করে কি হয়েছিল সংসার আর স্বামীসুখ বঞ্চিতা লীলার। লেখকের উপরে মন বিদ্রোহ করে ওঠে একেক সময়।

সেই সময় পড়ে নিরাসক্ত গঙ্গানারায়ণের জন্য পাগল ছিলাম। এত সুলিখিত ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস আর পড়িনি। এই উপন্যাসের শেষের বিবলিওগ্রাফি দেখে কিছু বই সৎ ও অসৎ দুই উপায়েই আয়ত্ত করেছিলাম।

আসলে বলতে গেলে বিরাট হয়ে যাবে লেখা। তার চাইতে আপনাদের একটা গল্প বলি – আমি বিদেশ বসবাসকালে খুবই ভাষাকাতর হয়ে পড়ি। ওখানকার লাইব্রেরিতে গিয়ে যে কয়টা বাংলা বই ছিল সব পড়লাম। দেখি হিন্দি বই- সব পড়লাম। বিখ্যাত মারাঠি উপন্যাস চিক্কবীর রাজেন্দ্রর হিন্দি অনুবাদ পেলাম (বাসায় এটার বাংলাটা আছে কিন্তু পড়িনি), সেটাও পড়লাম। সব হিন্দি বই শেষ হয়ে যাবার পরে ধরলাম মারাঠি বই। পড়া যায় কিন্তু বোঝা যায়না। বই পরদিন লাইব্রেরিতে ফিরিয়ে দিয়ে ট্রাভেল এজেন্সিতে চলে গেলাম ঢাকার প্লেনের সিট বুকিং দিতে।

কাহিনী

অগাষ্ট 20, 2011 § 2 টি মন্তব্য

রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন মনে হয় অফিস যেতে হবে তখন কিন্তু খারাপ লাগে না। খারাপ লাগে যখন অফিস থেকে বাসার আসার কথা ভাবি। কাকলীতে গিয়ে brtc-র বাসের টিকিট কিনে ঘন্টা দুয়েক দাঁড়াও তারপর যদি উঠতে পার। কি যে অসহ্য লাগে বলার মত না। সবাই যদি লাইন করে ওঠে, তাও হয়। কিন্তু বাস আসলেই যেভাবে সবাই জানোয়ারের মত ঝাঁপাঝাঁপি করতে থাকে, ঐটা পারা যায় না। এর চাইতে সারা রাত দাঁড়ায় থাকি- তাও ভাল। আর কোনক্রমে যদি বাসে ওঠা যায় তাহলেও যে খুব কপাল খুলে গেল তা না। মেয়েদের সিটে অনেক সময় (বীর) পুরুষরা বসে থাকে। সরকার বাহাদুরের উপর এক হাত তো নিতেই হবে (“সাহস কত! মাইয়া মাইন্সের জন্য সিট!”) । এরপর মোটামুটি ২ঘন্টা পর বাসায় ফেরত।

বাসায় ফিরে প্রায়ই দেখি কারেন্ট নাই। সোজা কথায় ঘামা মানুষ আরও ঘামি। ধুর মরণ! মাঝে মাঝে নিজের দিকে তাকাই। পথে ঘাটের অসহিষ্ণুতা আমাকেও পেড়ে ফেলছে। রাস্তার মানুষের সাথে যে খ্যাচর ম্যাচর করি। সেটা আজকাল দেখি অস্থি-মজ্জায় ঢুকে গেছে। কি জ্বালা!!